এবারের রোজা ও ঈদুল ফিতরকে ঘিরে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কেনাকাটায় কুমিল্লা সিটি করপেরেশন এলাকাসহ উপজেলাভিত্তিক গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে সুবাতাস বয়েছে ঈদের কনাকাটায়। গোটা রোজার মাসজুড়ে কুমিল্লার ঈদবাজারে নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চবিত্তের কেনাকাটায় টাকার প্রবাহ বৃদ্ধি ও মানুষের যে ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে এটি স্থানীয় অর্থনীতিকে বেশ গতিশীল করে তুলেছে বলে মন্তব্য অর্থনীতিবিদদের।
জনশক্তি রপ্তানি ও রেমিট্যান্স অর্জনে দেশের শীর্ষ জেলার তালিকায় থাকাটা কুমিল্লা বরাবরই দখলে রাখে। দেশের মোট প্রবাসীর ৯ শতাংশই কুমিল্লার। জাতীয় ও স্থানীয় অর্থনীতিতে কুমিল্লার প্রবাসীরা ব্যাপক অবদান রাখছেন। এবারের ঈদকে সামনে রেখে প্রবাসীদের প্রচুর রেমিটেন্স এসেছে স্বজনদের কাছে। এর ফলে ঈদের কেনাকাটা ঘিরে পুরো কুমিল্লায় অর্থনীতিতে চাঙ্গাভাব বিরাজ করেছে। উপজেলা সদর এবং গ্রামের বাজারগুলোতে লোকজনের উপস্থিতি এবং দোকানে দোকানে ক্রেতাদের হিড়িক পড়েছিল। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বাজারগুলো সরগরম ছিল। সাধ ও সাধ্যের মধ্যেই মানুষ কেনাকাটা করেছে। বেড়েছে অর্থের লেনদেন। রেকর্ড গড়েছে রেমিটেন্স আয়। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। কেননা, কুমিল্লা শহরের মানুষের চেয়ে উপজেলার সবচেয়ে বেশি মানুষ প্রবাসে কর্মরত।শহরের পাশপাশি গ্রামীণ জনপদগুলোতে ঈদ বাজার বেশ জমে উঠেছিল।
ঈদকেন্দ্রিক কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে শহরের পাশাপাশি গ্রামীণ জনপদও জমজমাট হয়ে উঠেছিল। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের বাইরে গ্রামের হাট-বাজার থেকে থেকে শুরু করে উপজেলা সদরের ছোটখাটো মার্কেট-দোকানগুলো কেনাকাটায় বেশ সরগরম ছিল। এর ফলে গ্রামীণ বাজারেও টাকার প্রবাহ বেড়েছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্তে¡ও মানুষ অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে কেনাকাটা করছেন। আশানুরূপ হয়েছে ঈদকেন্দ্রিক বিক্রিবাট্টা। শহর থেকে গ্রাম, কোথাও থেমে ছিল না কেনাকাটা। কুমিল্লা শহরের বাণিজ্যিক এলাকার বাইরে সদর দক্ষিণ উপজেলা, লালমাই, লাকসাম, নাঙ্গলকোট, বরুড়া, চৌদ্দগ্রাম, মনোহরগঞ্জ, দাউদকান্দি, চান্দিনা, দেবিদ্বার, বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া, মুরাদনগর, হোমনা উপজেলা সদরে রোজার শুরুর আগে রোজার বাজার, এরপর ইফতার সামগ্রী কেনা, সেহরীর বাজার এবং ঈদের কেনাকাটায় পোষাক থেকে শুরু করে জুতা, প্রসাধনী, ঘরের তৈজষপত্র, মসলাসহ নানা পণ্যের জমজমাট ব্যবসা হয়েছে।
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন ইনকিলাবকে জানান, ‘জেলার ৬০ লক্ষাধিক মানুষ এবারে প্রাণখুলে, স্বস্তিতে ঈদ উদযাপন করেছে। আর এই ঈদ উদযাপনকে কেন্দ্র করে তাদের স্বত:স্ফূর্ত কেনাকাটাতে ব্যবসার সকল ক্ষেত্রে আয়ের বাড়তি আবহ সৃষ্টি করেছে। এটি কেবল শহরেই নয়, গ্রামেও হয়েছে। কুমিল্লার গ্রামীণ অর্থনীতি অনেকটা কৃষি, সরকারি-বেসরকারি চাকরি এবং রেমিটেন্স নির্ভর। এবারের রোজার মাসে এসব খাতের অর্থ ঈদ বাজারে খরচ হয়েছে। বিদেশ থেকে পাঠানো অর্থ প্রবাসীর স্বজনরা ঈদ বাজারে খরচ করেছেন। এই অর্থ বাজারে ঘুরেছে অর্থাৎ টাকার প্রবাহ বেড়েছে। গ্রামের দোকানপাট, মার্কেটে যেমন বিক্রিবাট্টা প্রচুর হয়েছে, তেমনি গ্রামের অধিকাংশ মানুষ আবার নিজ উপজেলায় কেনাকাটার পরও শহরে এসেছেন কেনাকাটা করতে। এক্ষেত্রে প্রচুর ক্রেতা পরিবহন ব্যবহার করেছেন। এখানেও অর্থাৎ পরিবহন খাতেও অর্থনীতির চাকা ঘুরেছে। আবার রোজায় অনেক উপজেলায় গ্রামের পুরুষ-মহিলারা হাতে ভাজা মুড়ি উৎপাদন করে বাজারজাত করে অর্থ রোজগার করেছেন। এখান থেকে অর্জিত অর্থ রোজা ও ঈদের কেনাকাটায় খরচ করেছেন। গ্রামের অনেক মহিলাদের হাতে তৈরি নানারকম কারুপণ্য রোজার সময়ে ঈদকে কেন্দ্র করে শহরের বাজারে স্থান পেয়েছে। এখান থেকেও সেই আয় গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। গ্রাম পর্যায়ে যেসব পোলট্রি ফার্ম গড়ে ওঠেছে এসব ফার্মগুলোও এবারে ভালো ব্যবসা করেছে। কুমিল্লার খাদি ও বাটিক কাপড় উৎপাদনের কারখানাগুলো মুলত গ্রামীণ জনপদেই গড়ে তোলা হয়। ফলে গ্রামীণ শ্রমিকরাই এসব কারখানায় কাজ করে থাকেন। ঈদে এসব কাপড়ের ব্যাপক চাহিদার কারণে ক্রেতাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ এসেছে এই খাত থেকে।’
প্রফেসর স্বপন আরও যোগ করেন, ‘আমাদের মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস স্যার একজন অর্থনীতিবিদ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে ওনার নেতৃত্বে দেশ পরিচালিত হচ্ছে, ওনার শাসনামলে এবারে মুসলমানদের প্রধান ধমীয় উৎসব ইদুল ফিতর উদযাপিত হয়েছে এবং ঈদকেন্দ্রিক মানুষের ক্ষয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে।’
এদিকে দেশের মোট প্রবাসীর ৯ শতাংশই কুমিল্লার অধিবাসী। তারা নিয়মিতই পরিবারের কাছে টাকা পাঠান। তবে ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে প্রবাসীদের টাকা পাঠানোর হার বেড়েছিল। কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকার ব্যাংকের ব্যবস্থাপকরা জানান, সাধারণত ঈদ উৎসবে প্রবাসীরা পরিবারের কাছে বেশি রেমিট্যান্স পাঠান। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও রমজানের শুরু থেকেই রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। ব্যাংক থেকে তাদের পরিবার-পরিজনরা টাকা তুলে রোজা ও ঈদের জন্য খরচ করেছেন। যা স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করেছে।
কুমিল্লার ব্যবসায়ী নেতারা জানান, এবারে ঈদকে কেন্দ্র করে এখানকার মার্কেট, শপিংমল, ছোটখাটো দোকান, গ্রোসারী পণ্যের দোকান, ফুটপাতে যে পরিমান ব্যবসা হয়েছে এটি অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। কেবল শহরের দোকানপাট, মার্কেটগুলোতেই নয়, উপজেলা সদরের দোকানপাটেও এতো পরিমাণ বিক্রিবাট্টা হয়েছে, যা এবারের ঈদে ব্যবসায়ীদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়েছে। ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, কুমিল্লায় ঈদকেন্দ্রিক বেচাবিক্রি ঘিরে অর্থনীতিতে যে গতিশীলতা এসেছে ব্যবসায়ীরা এটির দীর্ঘমেয়াদী সুফল পাবেন। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত চাঙ্গা থাকার ইঙ্গিত মিলেছে এবারের ঈদবাজারে।
Last Updated on April 3, 2025 3:56 pm by প্রতি সময়